পাথরের খুঁটি থেকে ভেসে আসে সুর! ভারতের এই মন্দির আজও রহস্যে ঘেরা
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : ভারতের ইতিহাস ও স্থাপত্যের ভাণ্ডারে এমন অনেক নিদর্শন রয়েছে, যেগুলি আজও মানুষের বিস্ময়ের কারণ হয়ে রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেসব স্থাপনার রহস্য, সৌন্দর্য এবং নির্মাণশৈলী আজও গবেষকদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। তেমনই এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন হল কর্ণাটকের হামপি অঞ্চলে অবস্থিত বিখ্যাত বিঠ্ঠল মন্দির। তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির শুধু ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেই নয়, বরং তার অসাধারণ কারুকাজ ও বিস্ময়কর নির্মাণকৌশলের জন্যও বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
হামপি একসময় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। সেই সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য ও শিল্পচেতনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় বিঠ্ঠল মন্দির। বর্তমানে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করেছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ভিড় জমান।
এই মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল এর সুরেলা পাথরের খুঁটি। মন্দিরের প্রধান সভামণ্ডপে মোট ৫৬টি বিশেষ খুঁটি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলিকে সুরের খুঁটি বলেও ডাকা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই খুঁটিগুলিতে আলতো আঘাত করলে বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি শোনা যায়, যা অনেকের মতে সঙ্গীতের বিভিন্ন স্বরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
কীভাবে শত শত বছর আগে পাথরকে এমনভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। আধুনিক প্রযুক্তি এত উন্নত হওয়ার পরেও এই বিস্ময়কর নির্মাণকৌশল বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তোলে। তবে বর্তমানে এই খুঁটিগুলিকে স্পর্শ করা বা আঘাত করা নিষিদ্ধ, যাতে ঐতিহাসিক নিদর্শনের কোনও ক্ষতি না হয়।
মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে আরেকটি অনন্য স্থাপত্য—পাথরের রথ। এই রথটি এতটাই বিখ্যাত যে দেশের নতুন পঞ্চাশ টাকার নোটেও এর ছবি স্থান পেয়েছে। সম্পূর্ণ পাথর খোদাই করে তৈরি এই রথটি দেখলে মনে হয় যেন বাস্তব কোনও রথ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
রথটির সামনের অংশে দুটি হাতির মূর্তি রয়েছে, যা দেখে মনে হয় তারা যেন রথটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। রথের চাকাগুলিও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্মিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, একসময় এই চাকাগুলি ঘোরানো যেত। তবে সংরক্ষণের স্বার্থে পরে সেগুলিকে স্থির করে দেওয়া হয়েছে।
বিঠ্ঠল মন্দিরের আরেকটি বড় আকর্ষণ হল এর সূক্ষ্ম কারুকাজ। মন্দিরের দেয়াল, ছাদ এবং স্তম্ভজুড়ে খোদাই করা রয়েছে সেই সময়কার সমাজজীবনের নানা ছবি। কোথাও নৃত্যরত নারীর প্রতিচ্ছবি, কোথাও যুদ্ধের দৃশ্য, আবার কোথাও ধর্মীয় কাহিনির বর্ণনা ফুটে উঠেছে পাথরের গায়ে।
প্রতিটি খোদাই এতটাই নিখুঁত ও জীবন্ত যে মনে হয় যেন পাথর নয়, কোনও শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা ছবি দেখছেন। মন্দিরের প্রতিটি অংশে শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় মেলে।
ইতিহাসবিদদের মতে, ষোড়শ শতাব্দীতে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সময় এই মন্দিরের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। সম্রাট কৃষ্ণদেব রায়ের শাসনকালে এর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। মন্দিরটি ভগবান বিষ্ণুর বিঠ্ঠল রূপকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। সেই সময়ে এটি ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বর্তমানে হামপি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং ভারতের গৌরবময় অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী। এখানে এসে পর্যটকরা যেমন ইতিহাসের স্পর্শ পান, তেমনি অনুভব করেন প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য ও শিল্পকলার অনন্য মহিমা।
যাঁরা এই মন্দির দর্শনের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য ভোর বা বিকেলের সময় সবচেয়ে উপযুক্ত। সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের আলো যখন মন্দিরের পাথরের গায়ে পড়ে, তখন গোটা স্থাপত্য যেন সোনালি আভায় ঝলমল করে ওঠে। সেই দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
প্রাচীন ভারতের শিল্প, স্থাপত্য এবং নির্মাণকৌশলের এক অসামান্য নিদর্শন হিসেবে বিঠ্ঠল মন্দির আজও সমানভাবে বিস্মিত করে পর্যটক, গবেষক এবং ইতিহাসপ্রেমীদের। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এর রহস্য ও সৌন্দর্য অমলিন রয়েছে। তাই ইতিহাস ও স্থাপত্যের প্রতি সামান্য আগ্রহ থাকলেও জীবনে অন্তত একবার এই বিস্ময়কর মন্দির ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন