প্রশান্ত বর্মণকে গ্রেফতারের নির্দেশ হাইকোর্টের, স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুন মামলায় কড়া রায়
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : নিউটাউনের বহুল আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুন মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত রাজগঞ্জের প্রাক্তন বিডিও প্রশান্ত বর্মণকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে আগামী ১০ দিনের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য রাজ্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা এবং মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে না পারায় পুলিশের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত।
বুধবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এতদিন পরেও মূল অভিযুক্ত অধরা থাকা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, তদন্তের গতি এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। সেই কারণেই তদন্তকারী আধিকারিকের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল নেতার জামিনের আবেদন খারিজ
এই মামলায় আগেই গ্রেফতার হয়েছেন কোচবিহারের এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা সজল সরকার। তিনি সম্প্রতি জামিনের আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তবে বুধবার সেই আবেদন খারিজ করে দেয় আদালত।
বিচারপতির মতে, মামলার গুরুত্ব এবং তদন্তের বর্তমান অবস্থার কথা বিবেচনা করে এই মুহূর্তে অভিযুক্তকে জামিন দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে আপাতত জেল হেফাজতেই থাকতে হবে সজল সরকারকে।
তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ
শুনানির সময় আদালত জানতে চায়, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন মূল অভিযুক্ত প্রশান্ত বর্মণকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। এরপরই তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী আধিকারিকের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনও গুরুত্বপূর্ণ অপরাধমূলক মামলায় অভিযুক্ত দীর্ঘদিন অধরা থাকলে তা তদন্ত প্রক্রিয়ার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তির স্বার্থে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
কী ঘটেছিল নিউটাউনের সেই ঘটনায়?
গত বছরের ২৯ অক্টোবর নিউটাউন থানার অন্তর্গত যাত্রাগাছি এলাকার একটি খালপাড় থেকে উদ্ধার করা হয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার দেহ। অভিযোগ, তাঁকে অপহরণ করার পর খুন করা হয়েছিল। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
মৃতের পরিবারের দাবি ছিল, এই ঘটনায় প্রশান্ত বর্মণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা শুরু থেকেই তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয় এবং পরবর্তীতে মামলার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।
বিডিও পদ থেকে অপসারণ
অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসনিক স্তরেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রশান্ত বর্মণকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, তিনি একসময় আলিপুরদুয়ার জেলার কালচিনি ব্লকের বিডিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে প্রশাসনিক বদলির মাধ্যমে তিনি জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের বিডিও পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ওই পদে আর নেই।
মামলার তদন্ত চলাকালীন তিনি বিভিন্ন আদালতে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রথমে বারাসত ও বিধাননগর আদালত থেকে আগাম জামিন পেলেও সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয় পুলিশ। পরবর্তীতে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া চললেও মূল অভিযুক্তকে দীর্ঘদিন গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি কলকাতায় দেখা যায় প্রশান্ত বর্মণকে
কয়েকদিন আগে কলকাতার সল্টলেক এলাকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় প্রশান্ত বর্মণের নাম সামনে আসে। অভিযোগ, গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সেই ঘটনায় পুলিশ তাঁকে আটক করে এবং বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, যখন অভিযুক্ত প্রকাশ্যে শহরে ঘোরাফেরা করছেন, তখন খুনের মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করতে এত বিলম্ব কেন হচ্ছে? আদালতও এদিন সেই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখে।
তদন্তে নতুন গতি আসার আশা
হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর তদন্তে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ১০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে রাজ্য পুলিশকে। পাশাপাশি অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতারের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
নিউটাউন স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুন মামলাটি ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে আলোচিত। ফলে আগামী দিনে তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং আদালতের নির্দেশ কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর থাকবে সকলের।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন