তৃণমূলে ভাঙনের সুর! একসঙ্গে ১০১ কাউন্সিলরের ইস্তফায় চাপে মমতা

 


ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড়সড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর থেকেই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে অসন্তোষ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং দলত্যাগের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভা থেকে ইতিমধ্যেই ১০১ জন কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। এই ঘটনায় রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর সংগঠনের ভিত অনেক জায়গায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভোটে হারার পর সেই অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। বহু এলাকায় স্থানীয় স্তরের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কাটমানি আদায়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ উঠেছে। এর জেরেই একের পর এক পদত্যাগের ঘটনা সামনে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে।

কোন পুরসভা থেকে কতজন পদত্যাগ করেছেন

এখন পর্যন্ত যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে বিভিন্ন পুরসভা থেকে বহু কাউন্সিলর একযোগে ইস্তফা দিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে—

উত্তর ব্যারাকপুর — ১৫ জন

গারুলিয়া — ১৮ জন

কাঁথি — ১৪ জন

হালিশহর — ১৬ জন

ভাটপাড়া — ৩০ জন

ডায়মন্ড হারবার — ৮ জন

সব মিলিয়ে সংখ্যাটা ইতিমধ্যেই একশোর গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র সাংগঠনিক অসন্তোষ নয়, বরং ভবিষ্যতের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত হতে পারে।

ডায়মন্ড হারবারে বিশেষ চাপে শাসক দল

সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ডায়মন্ড হারবারের ঘটনা। কারণ এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই সাংসদ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই এলাকাতেই একসঙ্গে ৮ জন কাউন্সিলরের পদত্যাগ রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সাধারণ কর্মীদের মতামত গুরুত্ব পাচ্ছে না। দলীয় সিদ্ধান্ত কয়েকজন নেতার হাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর জেরেই ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

দুর্নীতির অভিযোগে বাড়ছে অস্বস্তি

শুধু পদত্যাগ নয়, বিভিন্ন এলাকায় দুর্নীতি এবং অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগও শাসক দলের অস্বস্তি বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই ১৭ জন কাউন্সিলর ও স্থানীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর। এই ঘটনাগুলি সামনে আসার পর বিরোধীরা শাসক দলকে তীব্র আক্রমণ শুরু করেছে।

বিরোধী শিবিরের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের উপর চাপ সৃষ্টি করে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছিল। যদিও তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলকে বদনাম করার চেষ্টা চলছে।

তবে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে শহর ও পুরসভা এলাকায় সংগঠনের ভিত দুর্বল হওয়ার লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে কঠিন পরীক্ষা

২০১১ সালে দীর্ঘ ৩৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর টানা বহু বছর রাজ্যের ক্ষমতায় থেকেছে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলের পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে।

এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল দলকে আবার সংগঠিত করা। কারণ নিচুতলার কর্মীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়লে আগামী দিনে রাজনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা নয়, সংগঠনের ভিত শক্ত রাখা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বুথ স্তর থেকে পুরসভা পর্যন্ত দলের কর্মীদের একজোট রাখা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ভাঙনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

“যারা যেতে চায়, তারা যেতে পারে”

কয়েকদিন আগেই দলীয় বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, যারা দল ছাড়তে চান তারা চলে যেতে পারেন। তিনি জানিয়েছিলেন, কেউ দল ছাড়লে তাতে তিনি ভেঙে পড়বেন না। প্রয়োজনে নতুন করে সংগঠন গড়ে তোলা হবে।

তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। একাংশের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দলের ভিতরে কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছেন। আবার অন্যদের মতে, এতে অসন্তুষ্ট নেতাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

আগামী দিনের রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাস পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। একদিকে শাসক দলের সাংগঠনিক সংকট, অন্যদিকে বিরোধীদের ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা— এই দুইয়ের লড়াইয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক ছবি আরও বদলাতে পারে।

বিশেষ করে পুরসভা ও স্থানীয় স্তরে যদি দলীয় ভাঙন অব্যাহত থাকে, তাহলে তার প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। এখন দেখার, তৃণমূল নেতৃত্ব কত দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে এবং দলীয় কর্মীদের আবার এক ছাতার তলায় আনতে সক্ষম হয় কিনা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ফিরহাদের ইস্তফা, অভিষেককে তলব, ঋতব্রতের উত্থান! একদিনে তৃণমূলে তিন বড় ধাক্কা

১ জুন পার, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের অনলাইন ফর্ম নিয়ে ধোঁয়াশা! পোর্টালে নেই নতুন আপডেট

বাংলায় ১৫২টির মধ্যে ১১০টিরও বেশি আসনে জয়ের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর