তৃণমূলে বড় ভাঙন! সব পদ ছাড়লেন কাকলি ঘোষ, ইস্তফা দুই কাউন্সিলরেরও
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে অসন্তোষ এবং ভাঙনের জল্পনা ক্রমশ বাড়ছে। দলের একাধিক জনপ্রতিনিধি ও নেতার পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। এবার লোকসভায় তৃণমূলের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দলের সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে কলকাতা পুরসভার দুই কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ ও অরূপ চক্রবর্তীর দল ছাড়ার ঘোষণাও রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি দলের নেতৃত্বের প্রতি নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। সেই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই বুধবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান। এই ঘটনাকে রাজনৈতিক মহলের একাংশ বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখছে।
জানা গিয়েছে, কল্যাণীতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে উপস্থিত থাকার পর থেকেই কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তিনি ওই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই দলের অন্দরে তাঁর অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাই তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত। তিনি দলের মহিলা শাখার সর্বভারতীয় সভানেত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি দলের বিভিন্ন সামাজিক ও জনসংযোগমূলক কর্মসূচিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বারাসাত কেন্দ্র থেকে একাধিকবার লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট বলেই মনে করা হয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সিকে লেখা একটি চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছেন যে তিনি আর কোনও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত দলের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনও প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, কাকলি ঘোষ দস্তিদার তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের সময় জানিয়েছিলেন যে তিনি অবশেষে স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছেন। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়। যদিও কাকলি ঘোষ দস্তিদার এই বিষয়ে সরাসরি প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি।
এদিকে কলকাতা পুরসভাতেও তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে অস্বস্তি বেড়েছে। তৃণমূলের কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ এবং অরূপ চক্রবর্তী দলীয় পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। এর আগে দেবলীনা বিশ্বাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। ফলে একের পর এক পদত্যাগে দলের অন্দরে চাপ বাড়ছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সুশান্ত ঘোষ পুরসভার বরো নম্বর বারোর চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। অন্যদিকে অরূপ চক্রবর্তী পুরসভার হিসাব সংক্রান্ত কমিটির দায়িত্ব ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। দলীয় সূত্রের মতে, শুধু এই কয়েকজনই নন, আগামী দিনে আরও কয়েকজন নেতা ও জনপ্রতিনিধি পদত্যাগ করতে পারেন বলেও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউন্সিলরদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সেখানে তিনি সকলকে আরও বেশি সক্রিয়ভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন বলে জানা যায়। দলকে শক্তিশালী করতে সংগঠনের ভিত মজবুত করার বার্তাও দেন তিনি। তবে সেই বৈঠকের পরের দিনই একাধিক পদত্যাগের খবর সামনে আসায় রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। বিভিন্ন দলের নেতাদের অবস্থান বদল এবং দলীয় অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসায় আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শাসকদলের অভ্যন্তরে অসন্তোষের এই ছবি বিরোধীদের হাতেও বড় রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের দাবি, দল এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার জন্য সংগঠনের উপর বড় কোনও প্রভাব পড়বে না। দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, সকলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই সংগঠন পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যে কোনও সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করার চেষ্টা চলছে।
আগামী দিনে এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন