এভারেস্টে মৃত্যুর পর কেন অনেক পর্বতারোহীর মরদেহ সেখানেই থেকে যায়?
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক :বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা বহু মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের পথ অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বছর শত শত পর্বতারোহী এভারেস্টে আরোহণের চেষ্টা করেন, আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ আর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন না। সম্প্রতি হায়দরাবাদের প্রযুক্তি পেশাজীবী অরুণ কুমার তিওয়ারির মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
অরুণ কুমার তিওয়ারি সফলভাবে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করেছিলেন। তবে ফেরার পথে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। জানা যায়, তিনি রক্তবমি করতে শুরু করেন এবং উচ্চতাজনিত জটিলতার কারণে তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। সঙ্গে থাকা শেরপারা তাঁকে বাঁচানোর জন্য বহু চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর পরিবারের সিদ্ধান্ত। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অরুণের মরদেহ এভারেস্ট থেকেই আর নিচে নামানো হবে না। তাঁদের বিশ্বাস, তিনি ছিলেন একজন গভীর শিবভক্ত এবং এখন তিনি হিমালয়ের কোলে, শিবের সান্নিধ্যেই চিরনিদ্রায় শায়িত থাকবেন।
কেন এভারেস্ট থেকে মরদেহ নামানো এত কঠিন?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, পরিবারের সদস্যের মরদেহ কেন বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় না? এর প্রধান কারণ হলো এভারেস্টের প্রতিকূল পরিবেশ।
এভারেস্টে ৮,০০০ মিটারের ওপরে যে অঞ্চল রয়েছে, তাকে বলা হয় ‘ডেথ জোন’। এই উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কম থাকে। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের বহু নিচে নেমে যায় এবং প্রবল বাতাস বইতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে জীবিত মানুষের পক্ষে চলাফেরা করাই কঠিন, সেখানে একটি মরদেহ বহন করে নামানো আরও বিপজ্জনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরফে জমে থাকা একটি মরদেহের ওজন অনেক সময় ১২০ থেকে ১৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। এই ওজন বহন করে বিপজ্জনক ঢাল বেয়ে নিচে নামা উদ্ধারকর্মীদের জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করে।
কারা এই কাজ করেন?
এভারেস্টে উদ্ধার ও মরদেহ উদ্ধারের কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেরপারা। নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলের এই অভিজ্ঞ মানুষরা দীর্ঘদিন ধরে পর্বতারোহীদের গাইড হিসেবে কাজ করে আসছেন।
তাঁরাই সাধারণত বিপদগ্রস্ত আরোহীদের উদ্ধার করেন এবং প্রয়োজনে মরদেহ নামানোর দায়িত্ব নেন। এছাড়া কিছু বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল ও নেপালের সেনাবাহিনীও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই কাজে অংশ নেয়।
তবে এই কাজের সময় উদ্ধারকারীদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অতীতে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মরদেহ উদ্ধারের সময় উদ্ধারকর্মীরাও প্রাণ হারিয়েছেন।
মরদেহ নামানোর সিদ্ধান্ত কে নেয়?
মরদেহ নিচে নামানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত সাধারণত মৃত পর্বতারোহীর পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে—
- উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তা
- আবহাওয়ার পরিস্থিতি
- মরদেহের অবস্থান
- পরিবারের ইচ্ছা
- আর্থিক সামর্থ্য
যদি মরদেহ এমন জায়গায় থাকে যেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তাহলে অনেক সময় উদ্ধার অভিযান চালানো হয় না। আবার কিছু পরিবার ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে মরদেহ সেখানেই রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
খরচও বড় বাধা
এভারেস্ট থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করে নিচে নিয়ে আসার খরচ অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই খরচ কয়েক লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে এক কোটিরও বেশি হতে পারে।
অরুণ তিওয়ারির ক্ষেত্রেও প্রথমে এক কোটির বেশি এবং পরে প্রায় ৯৪ লক্ষ টাকা খরচের কথা জানানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বিপুল অর্থ অল্প সময়ের মধ্যে জোগাড় করা অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই সম্ভব নয়।
যদি পর্বতারোহীর বীমা (ইনস্যুরেন্স) থাকে, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে সেই ব্যয়ের একটি অংশ বীমা সংস্থা বহন করতে পারে। তবে সেক্ষেত্রেও নানা নিয়ম ও শর্ত প্রযোজ্য হয়।
এভারেস্টে কত মরদেহ রয়ে গেছে?
বিগত কয়েক দশকে এভারেস্টে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন পর্বতারোহণ বিষয়ক তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এখনও দুই শতাধিক মরদেহ পর্বতের বিভিন্ন অংশে রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রবল ঠান্ডার কারণে অনেক মরদেহ প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে। বরফ গলে গেলে সেগুলি কখনও কখনও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাই সময়ে সময়ে নেপাল সরকার ও সেনাবাহিনী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে কিছু মরদেহ সরিয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে।
‘গ্রিন বুটস’ ও ‘স্লিপিং বিউটি’— এভারেস্টের পরিচিত দুই গল্প
এভারেস্টের ইতিহাসে কয়েকটি মরদেহ বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে অন্যতম ‘গ্রিন বুটস’। এই নামটি ভারতের লাদাখের বাসিন্দা এবং আইটিবিপি সদস্য সে ওয়াং পালজোরের সঙ্গে জড়িত। ১৯৯৬ সালের ভয়াবহ তুষারঝড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সবুজ রঙের জুতার কারণে সেই স্থানটি পর্বতারোহীদের কাছে একটি পরিচিত চিহ্ন হয়ে ছিল।
আরেকটি পরিচিত নাম ‘স্লিপিং বিউটি’। এটি মার্কিন পর্বতারোহী ফ্রান্সিস আর্সেনটিয়েভকে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে এভারেস্ট জয়ের পর ফেরার পথে তিনি প্রাণ হারান। বহু বছর ধরে তাঁর মরদেহ আরোহণের পথের ধারে দৃশ্যমান ছিল। পরে একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে সেটিকে মূল পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মাউন্ট এভারেস্ট শুধু সাহস ও সাফল্যের প্রতীক নয়, এটি মানুষের সীমাবদ্ধতারও একটি কঠিন স্মারক। অরুণ কুমার তিওয়ারির ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের আনন্দের পাশাপাশি কত বড় ঝুঁকিও লুকিয়ে থাকে। অনেক সময় প্রিয়জনের মরদেহ ঘরে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি, নিরাপত্তা এবং বিপুল ব্যয়ের কারণে পরিবারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই কারণেই এভারেস্টের বরফঢাকা ঢালে আজও বহু পর্বতারোহী চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন