বয়স অনুযায়ী কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন? সুস্থ থাকতে জেনে নিন সঠিক নিয়ম
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনযাত্রা এতটাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে যে অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কেউ অফিসের কাজের চাপে ভোরে উঠে পড়ছেন, আবার কেউ গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ঘুমের সময় কমিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে ঘুমের মান নষ্ট হচ্ছে এবং শরীরের উপর ধীরে ধীরে খারাপ প্রভাব পড়ছে। অনেকের ধারণা, কম ঘুমিয়েও শরীর ঠিকভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম সুস্থ থাকার জন্য খাবার ও পানির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের অভাবে শুধু ক্লান্তিই আসে না, এর সঙ্গে দেখা দিতে পারে খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগের অভাব, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিন সঠিক পরিমাণে ঘুম শরীরকে বিশ্রাম দেয়, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব বয়সের মানুষের ঘুমের প্রয়োজন এক রকম নয়। শিশু, কিশোর, তরুণ কিংবা প্রবীণ— প্রত্যেকের শরীরের চাহিদা অনুযায়ী ঘুমের সময় আলাদা হয়ে থাকে। তাই বয়স অনুযায়ী কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
নবজাতক শিশুর ঘুম
জন্মের পর একটি শিশুর শরীর ও মস্তিষ্ক খুব দ্রুত বিকাশ লাভ করতে থাকে। এই সময় তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেতে শুরু করে। তাই নবজাতক শিশুর সবচেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হয়। সাধারণত একটি নবজাতক শিশুর দিনে ও রাতে মিলিয়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমানো প্রয়োজন।
এই বয়সে শিশুরা একটানা দীর্ঘ সময় ঘুমায় না। কিছুক্ষণ পরপর জেগে ওঠে এবং আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কারণ তখনও তাদের শরীর দিন ও রাতের নির্দিষ্ট অভ্যাস পুরোপুরি তৈরি করতে পারে না। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ঘুম
যেসব শিশুর বয়স সাধারণত ৬ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে, তাদের প্রতিদিন প্রায় ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এই বয়সে শিশুরা পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং নানা ধরনের মানসিক কর্মকাণ্ডে খুব সক্রিয় থাকে। তাই শরীর ও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন হয়।
সঠিক পরিমাণে ঘুম হলে শিশুদের স্মৃতিশক্তি বাড়ে, পড়াশোনায় মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং শেখার ক্ষমতা উন্নত হয়। অন্যদিকে ঘুম কম হলে তারা সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, বিরক্ত হয় এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে। অনেক সময় ঘুমের অভাবে শিশুদের আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়।
কিশোর বয়সে ঘুমের গুরুত্ব
১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সকে কিশোর বয়স ধরা হয়। এই সময় শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই বড় পরিবর্তন আসে। তাই এই বয়সে প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে অনেক কিশোর গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটায় বা পড়াশোনার চাপের কারণে দেরিতে ঘুমায়। এর ফলে তাদের ঘুমের মান কমে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যেতে পারে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে এবং মানসিক চাপ বাড়তে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম কিশোরদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি শরীরে শক্তি বজায় রাখে এবং দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে।
প্রাপ্তবয়স্কদের কত ঘণ্টা ঘুম দরকার
১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের জন্য প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমকে আদর্শ ধরা হয়। এই বয়সে কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নানা ধরনের মানসিক দুশ্চিন্তার কারণে অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন কম ঘুম শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে বিশ্রাম দেয়, মস্তিষ্ককে সতেজ রাখে এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
এছাড়া ভালো ঘুম মানসিক চাপ কমায় এবং কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ায়। যাদের ঘুম কম হয়, তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, রক্তে শর্করা বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার অভ্যাস শরীরের জন্য খুবই উপকারী। ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন বা অন্যান্য পর্দা ব্যবহার কমালে ঘুমের মান আরও ভালো হয়।
প্রবীণদের ঘুমের প্রয়োজন
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। তাই তাদের জন্য সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট বলে মনে করা হয়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ঘুম হালকা হয়ে যায় এবং রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।
ভালো ঘুম প্রবীণদের স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি শরীরের ক্লান্তি দূর করে এবং সারাদিন সক্রিয় থাকতে সহায়তা করে।
অনেক প্রবীণ মানুষ দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমিয়ে ফেলেন, যার ফলে রাতে ঘুমে সমস্যা হয়। তাই চিকিৎসকেরা দিনে অতিরিক্ত না ঘুমিয়ে নিয়ম মেনে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন।
কেন পর্যাপ্ত ঘুম এত গুরুত্বপূর্ণ
ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, এটি শরীরের পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। ঘুমের সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে এবং মস্তিষ্ক সারাদিনের তথ্য সংরক্ষণ করে। ভালো ঘুম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব থাকলে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—
সবসময় ক্লান্ত লাগা
মাথাব্যথা
মনোযোগ কমে যাওয়া
মানসিক চাপ বৃদ্ধি
রাগ ও বিরক্তি বাড়া
হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
ওজন বেড়ে যাওয়া
তাই বয়স অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে ঘুমানো অত্যন্ত জরুরি। সুস্থ শরীর ও ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন। পর্যাপ্ত ঘুম আপনাকে শুধু সতেজই রাখবে না, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনেও সাহায্য করবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন