২৫ মে থেকে শুরু ‘নৌতপা’! টানা ৯ দিনের তীব্র দাবদাহ, কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন নিজেকে ও পরিবারকে?



ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : গরমের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘নৌতপা’। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে সূর্য যখন রোহিণী নক্ষত্রে প্রবেশ করে, তখন শুরু হয় এই বিশেষ সময়। চলতি বছরে ২৫ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত চলবে নৌতপা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ৯ দিনে সূর্যের তাপ ও প্রভাব পৃথিবীর উপর সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে বাড়তে থাকে তাপমাত্রা, দেখা দেয় লু, জলশূন্যতা, মাথা ঘোরা, জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতার মতো নানা সমস্যা।

গ্রামবাংলায় বহু প্রবীণ মানুষ এখনও নৌতপার সময় দুপুরে বাইরে বেরোতে নিষেধ করেন। কারণ এই সময় অসাবধানতা শরীরের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা জরুরি। চিকিৎসকরাও বলছেন, এই সময়ে খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম ও শরীর ঠান্ডা রাখার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

নৌতপা কী?

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রাচীন ভারতীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী, সূর্য যখন রোহিণী নক্ষত্রে প্রবেশ করে, তখন শুরু হয় নৌতপা। ‘নৌ’ অর্থ নয় এবং ‘তপা’ অর্থ তাপ। অর্থাৎ টানা নয় দিনের প্রচণ্ড গরমকেই বলা হয় নৌতপা। অনেকে মনে করেন, এই সময়ের তীব্র গরম প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতিরিক্ত গরমের ফলে বাতাসে জমে থাকা আর্দ্রতা কমে এবং বর্ষার আগমনের পরিবেশ তৈরি হয়।

কেন এই সময়ে বাড়ে অসুস্থতার ঝুঁকি?

অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে দ্রুত জল ও লবণ বেরিয়ে যায়। ফলে শরীরে জলশূন্যতা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে লু লাগা, মাথাব্যথা, বমি, দুর্বলতা, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। অনেক সময় শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে প্রাণঘাতী অবস্থাও তৈরি হয়।

তাই নৌতপার সময় কিছু নিয়ম মেনে চললে সহজেই সুস্থ থাকা সম্ভব।

নৌতপার তীব্র গরম থেকে বাঁচতে মানুন এই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

১. পর্যাপ্ত জল পান করুন

গরমে শরীর সুস্থ রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হল বেশি করে জল পান করা। অল্প অল্প করে বারবার জল খেলে শরীর ঠান্ডা থাকে এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি কমে। ডাবের জল, লেবুর শরবত, তরমুজ, শসা ও ঘরে তৈরি ফলের রসও শরীরকে সতেজ রাখে।

২. দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলুন

সকাল শেষে দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদ সবচেয়ে বেশি তীব্র থাকে। এই সময় প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে বেরোলে মাথা কাপড় বা ছাতা দিয়ে ঢেকে রাখুন।

৩. হালকা রঙের সুতির পোশাক পরুন

গাঢ় রঙের পোশাক দ্রুত তাপ শোষণ করে। তাই সাদা বা হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরা উচিত। এতে শরীরে বাতাস চলাচল সহজ হয় এবং ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায়।

৪. শরীর ঠান্ডা রাখুন

দিনে একাধিকবার মুখ ও হাত ঠান্ডা জলে ধুয়ে নিন। প্রয়োজনে ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে নিতে পারেন। ঘর হাওয়াদার রাখুন এবং অতিরিক্ত গরমে ঠান্ডা পরিবেশে থাকার চেষ্টা করুন।

৫. তেল-মশলাযুক্ত খাবার কম খান

গরমে হজমের সমস্যা বাড়ে। তাই ভাজাভুজি ও অতিরিক্ত মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলুন। ভাত, ডাল, সবজি, টক দই, ফল ও সালাদ খেলে শরীর হালকা থাকে এবং শক্তিও বজায় থাকে।

৬. অতিরিক্ত পরিশ্রম করবেন না

প্রচণ্ড গরমে ভারী কাজ বা অতিরিক্ত শরীরচর্চা করলে দ্রুত ক্লান্তি আসে। অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে জল ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। তাই এই সময় বিশ্রাম নেওয়াও জরুরি।

৭. শিশু ও বয়স্কদের দিকে বিশেষ নজর দিন

শিশুদের শরীর দ্রুত গরম হয়ে যায়। আবার বয়স্কদের অনেকের শরীরে গরম সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে। তাই তাদের পর্যাপ্ত জল, হালকা খাবার ও ঠান্ডা পরিবেশে রাখুন।

৮. রোদে দাঁড় করানো গাড়িতে কাউকে রাখবেন না

বন্ধ গাড়ির ভিতরে তাপমাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে যায়। এতে শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিশুদের কখনও একা গাড়িতে রেখে যাবেন না।

৯. লু লাগার লক্ষণ চিনে রাখুন

হঠাৎ মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, বমি, জ্বর, দুর্বলতা, ত্বক শুকিয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি—এসবই লু লাগার লক্ষণ হতে পারে। এমন হলে দ্রুত ছায়াযুক্ত জায়গায় নিয়ে গিয়ে জল খাওয়ান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

১০. জ্বর বা অসুস্থতায় ঠান্ডা জল ব্যবহার করুন

কারও শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে কপালে ঠান্ডা জলের কাপড় রাখুন। হাত-পা ও তালু ঠান্ডা জলে মুছে দিলে শরীরের তাপ কিছুটা কমে। তবে অবস্থা গুরুতর হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি।

নৌতপা নিয়ে প্রচলিত কিছু বিশ্বাস

গ্রামাঞ্চলে এখনও বিশ্বাস করা হয়, নৌতপার সময় যদি ভালোভাবে গরম না পড়ে, তবে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে। যদিও এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ স্পষ্ট নয়, তবুও বহু মানুষ এই সময়কে প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পর্যায় হিসেবে মানেন।

অনেকে আবার এই সময়ে পেঁয়াজ, আমপানা বা ঘোল খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ এগুলি শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।

সুস্থ থাকতে সচেতনতা জরুরি

নৌতপার তীব্র গরমকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সামান্য অসাবধানতা থেকেও বড় শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই পর্যাপ্ত জল পান, সঠিক খাবার, বিশ্রাম এবং রোদ এড়িয়ে চলার মতো সাধারণ নিয়ম মানলেই এই কঠিন সময়েও সুস্থ থাকা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া সবচেয়ে জরুরি। কারণ তাদের শরীর দ্রুত তাপের প্রভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পরিবারের সকলের যত্ন নিন এবং নৌতপার এই ৯ দিনে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মুর্শিদাবাদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি! কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনেই তৃণমূল ও হুমায়ুন কবীর সমর্থকদের সংঘর্ষে চাঞ্চল্য

বাংলায় ১৫২টির মধ্যে ১১০টিরও বেশি আসনে জয়ের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আম আদমি পার্টিতে ফাটল! রাঘব-স্বাতি সহ বিজেপিতে একাধিক সাংসদ