করোনা-যুদ্ধ-জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ! দ্য হেগে বিশ্বকে সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি

 


ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন। সেখানে তিনি শুধু ভারত-নেদারল্যান্ডস সম্পর্ক নিয়েই কথা বলেননি, একইসঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে করোনা মহামারি, যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে পৃথিবী একের পর এক বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রথমে করোনা মহামারি গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। তারপর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়ে। বর্তমানে জ্বালানি সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান দশক যেন বিশ্ববাসীর কাছে দুর্যোগের দশক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি দ্রুত এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তাহলে গত বহু দশকে বিশ্বের যে উন্নয়ন হয়েছে তার অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, বিশ্বের বহু মানুষ আবার দারিদ্র্যের অন্ধকারে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারেন। এই কারণেই বিশ্বের দেশগুলিকে এখন একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল নিজের দেশের উন্নয়ন নয়, বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখার দায়িত্বও সব দেশের।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব বাড়ছে। করোনা পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ বুঝতে পেরেছে যে এককভাবে কোনও দেশের ওপর নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ভারত এবং নেদারল্যান্ডস একসঙ্গে এমন একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে। তাঁর মতে, দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের ভারত দ্রুত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে চলেছে। দেশের মানুষের স্বপ্ন, আশা এবং প্রত্যাশা এখন আগের তুলনায় অনেক বড় হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন উন্নত জীবনযাপন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং শক্তিশালী অর্থনীতির প্রত্যাশা করছেন। এই পরিবর্তিত মানসিকতাই ভারতকে নতুন গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও পৌঁছে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নেদারল্যান্ডস সফরে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ সম্মান জানানো হয়। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান সে দেশের বিদেশমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন, নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ আধিকারিক লুডগার ব্রুম্মেলার এবং নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত কুমার তুহিন। ভারতীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরাও প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে উৎসাহ প্রকাশ করেন। বহু মানুষ ভারতীয় পতাকা হাতে নিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রীও তাঁদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য প্রবাসী ভারতীয়দের প্রশংসা করেন।

এবারের বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট পাঁচটি দেশ সফর করছেন। নেদারল্যান্ডস সেই সফরের দ্বিতীয় পর্যায়। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, কৃষি, পরিবেশবান্ধব শক্তি এবং শিক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত ও নেদারল্যান্ডসের সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ দুই দেশই প্রযুক্তি উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় নেদারল্যান্ডস সফর। এর আগে তিনি ২০১৭ সালে সেখানে গিয়েছিলেন। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে। একসময় ভারত ও নেদারল্যান্ডসের সম্পর্ক মূলত বাণিজ্য, কৃষি, জল ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সম্পর্কের পরিধি অনেক বেড়েছে। এখন দুই দেশ প্রযুক্তি উদ্ভাবন, অর্ধপরিবাহী শিল্প, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা, নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং উচ্চশিক্ষার মতো ক্ষেত্রেও একসঙ্গে কাজ করছে।

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্পক্ষেত্রের দ্রুত অগ্রগতির কারণে নেদারল্যান্ডসের বহু সংস্থা ভারতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। একইভাবে ভারতীয় সংস্থাগুলিও ইউরোপের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে নেদারল্যান্ডসকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে সমুদ্রবন্দর, কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে শান্তি ও সহযোগিতাই উন্নয়নের প্রধান পথ। যুদ্ধ এবং সংঘাত কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং মানবকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জানান, ভারত সবসময় শান্তি, সহযোগিতা এবং মানবতার পক্ষে কথা বলেছে এবং ভবিষ্যতেও সেই নীতিতেই এগিয়ে চলবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর শুধু কূটনৈতিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারত তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ভবিষ্যতে ভারতের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ফিরহাদের ইস্তফা, অভিষেককে তলব, ঋতব্রতের উত্থান! একদিনে তৃণমূলে তিন বড় ধাক্কা

১ জুন পার, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের অনলাইন ফর্ম নিয়ে ধোঁয়াশা! পোর্টালে নেই নতুন আপডেট

বাংলায় ১৫২টির মধ্যে ১১০টিরও বেশি আসনে জয়ের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর