১.৬৯ কোটি জাতিগত শংসাপত্র নিয়ে বড় তদন্ত, কড়া পদক্ষেপে শুভেন্দু সরকার
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গে সদ্য গঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির নতুন সরকার প্রশাসনিক স্তরে একাধিক বড় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার এবার রাজ্যে গত ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেওয়া সমস্ত তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির শংসাপত্র পুনরায় যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, গত কয়েক বছরে বহু ভুয়ো এবং অযোগ্য ব্যক্তির হাতে এই শংসাপত্র পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেই কারণেই এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের অনগ্রসর কল্যাণ দফতরের পক্ষ থেকে সমস্ত জেলাশাসকদের কাছে একটি নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, ২০১১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ঊনসত্তর লক্ষ জাতিগত শংসাপত্র প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে বহু শংসাপত্রের সত্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাই প্রতিটি মহকুমা শাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অধীনে থাকা সমস্ত শংসাপত্রের পুনরায় খুঁটিনাটি যাচাই করতে হবে।
সরকারি আধিকারিকদের বক্তব্য, বহু ক্ষেত্রে সঠিক তদন্ত ছাড়াই দ্রুততার সঙ্গে শংসাপত্র প্রদান করা হয়েছিল। অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত যোগ্যতার যাচাই ছাড়াই এই শংসাপত্র দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জঙ্গলমহল অঞ্চলে ভোটব্যাঙ্ক মজবুত করার লক্ষ্যে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, “দুয়ারে সরকার” কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছিল। সেই আবেদনগুলির ভিত্তিতে প্রায় সাতচল্লিশ লক্ষেরও বেশি শংসাপত্র প্রদান করা হয়। এর মধ্যে তফসিলি জাতির শংসাপত্রের সংখ্যা ছিল বত্রিশ লক্ষেরও বেশি। তফসিলি জনজাতির ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা ছয় লক্ষের উপরে এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য প্রায় নয় লক্ষ শংসাপত্র দেওয়া হয়েছিল।
সরকারি কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, সেই সময় দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির জন্য ব্যাপক চাপ তৈরি করা হয়েছিল। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আবেদনকারীদের পারিবারিক নথি, সামাজিক অবস্থান এবং পূর্ববর্তী তথ্য সঠিকভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি। প্রশাসনের একাংশের মতে, এই তাড়াহুড়োর ফলেই বহু অযোগ্য ব্যক্তি সরকারি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেয়ে যান।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন এই ধরনের শংসাপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যদেরও একই ধরনের সুবিধা দেওয়া শুরু হয়। অর্থাৎ একবার কোনও পরিবার ভুলভাবে এই শংসাপত্র পেয়ে গেলে ভবিষ্যতেও সেই সুবিধা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। এর ফলে প্রকৃত তফসিলি ও অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
অনেকের আশঙ্কা ছিল, অযোগ্য ব্যক্তিরা সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে গেলে প্রকৃত দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষ সরকারি চাকরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে নিজেদের ন্যায্য অধিকার হারাবেন। বিভিন্ন মহকুমা দফতরে এ নিয়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও আগের সরকার সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলেই দাবি বর্তমান প্রশাসনের।
বিশেষ করে জঙ্গলমহল অঞ্চলে এই ইস্যু নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল। ওই অঞ্চলে তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের একাংশের অভিযোগ ছিল, প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ভারতীয় জনতা পার্টি নির্বাচনের আগে এই বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনে। স্থানীয় মানুষের ক্ষোভকে সামনে রেখে দলটি সেখানে নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছে। জঙ্গলমহলের বহু আসনে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে নতুন শাসকদল।
নতুন নির্দেশিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি পরিচালিত বিশেষ পর্যালোচনায় যেসব ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের জাতিগত শংসাপত্রও নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে সেই শংসাপত্র বাতিল করার পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
রাজ্য সরকার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, এই পুনরায় যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনও রকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। যদি কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি শংসাপত্রের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর পারিবারিক ইতিহাস, সামাজিক পরিচয়, স্থানীয় নথি এবং অন্যান্য সরকারি তথ্য খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল প্রকৃত যোগ্য মানুষদের অধিকার নিশ্চিত করা। সরকারের মতে, সংরক্ষণের সুবিধা শুধুমাত্র তাঁদেরই পাওয়া উচিত, যাঁরা সত্যিই সামাজিক ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। কোনওভাবেই ভুয়ো নথির মাধ্যমে সরকারি সুযোগ নেওয়ার প্রবণতাকে আর প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে নতুন সরকার দাবি করছে, তারা দুর্নীতি রুখে স্বচ্ছ প্রশাসন গড়তে চাইছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এই পদক্ষেপের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর অবশেষে প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
আগামী কয়েক মাসে এই পুনরায় যাচাই প্রক্রিয়া রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক শংসাপত্র পুনরায় পরীক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ হলেও সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে তা ভবিষ্যতে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন