“সংবিধান না বন্দুক, শেষ কথা বলবে আইনই”, কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ মমতার
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রবিবার কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে অভিযোগ করেন, দেশে এখন “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পরিবেশ” তৈরি করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, সংবিধান রক্ষার লড়াই তিনি শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাবেন এবং মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার যেকোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আইনি পথে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
কলকাতায় দলীয় কর্মী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তাঁর সরকার সবসময় উন্নয়ন, পুনর্বাসন ও মানবিকতার রাজনীতি করেছে। অথচ বর্তমানে প্রশাসনিক পদক্ষেপের নামে বহু সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে এবং জীবিকার পথ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বদলে ভয় দেখিয়ে শাসন করার প্রবণতা বাড়ছে।
তিনি বলেন, “আমরা যখন উন্নয়নের কাজ করেছি, তখন মানুষের কথা ভেবে করেছি। কোনও পরিবারকে রাস্তায় ফেলে রেখে উন্নয়নের নাম করা যায় না। আজ যেভাবে উচ্ছেদের নামে মানুষের মাথার উপর থেকে ছাদ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”
নিজের বক্তব্যে তিনি অতীতের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কল্যাণী এক্সপ্রেস সেতু নির্মাণের সময় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় তাঁর সরকার প্রতিটি পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিল। সমান আকারের বাড়ি তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল যাতে কেউ অসহায় অবস্থায় না পড়েন।
তাঁর কথায়, “উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা সেতু তৈরি নয়। উন্নয়ন তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন মানুষের জীবনও সুরক্ষিত থাকে। আমরা কাউকে উচ্ছেদ করিনি, আমরা পুনর্বাসন করেছি। আজ সেই মানবিকতা আর দেখা যাচ্ছে না।”
কেন্দ্র সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি আরও বলেন, ক্ষমতার জোর চিরস্থায়ী নয়। একদিন জনগণই সবকিছুর জবাব দেবে। তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষের কষ্ট ও ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে এবং সময় এলে তারই প্রতিফলন দেখা যাবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ক্ষমতা চিরদিন কারও হাতে থাকে না। মানুষ সব দেখছে। যাঁরা আজ জোর করে মানুষের ঘর ভাঙছেন, একদিন তাঁদেরও জবাব দিতে হবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষা করছি।”
নিজের বক্তৃতায় তিনি বিচারব্যবস্থার প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর দাবি, দেশের সংবিধানই সর্বোচ্চ শক্তি এবং আইনের উপরে কেউ নয়। তিনি বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, আইন ও সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব আদালতের। সেই কারণেই তিনি আইনি পথেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
তৃণমূল নেত্রীর কথায়, “সংবিধান দেশের মানুষের অধিকার রক্ষা করে। যদি মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হয়, তাহলে আইনই শেষ কথা বলবে। আমি আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। দেখা যাবে শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী কে—সংবিধান, না ভয় দেখানোর রাজনীতি।”
সম্প্রতি হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অবৈধ নির্মাণ সরানোর নামে প্রশাসনের তরফে বড়সড় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। বিপুল পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতিতে একাধিক দোকান ও কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। প্রশাসনের দাবি ছিল, দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি দখলদারির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল এবং নিরাপত্তার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাজ্যে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, গরিব মানুষের জীবিকা ধ্বংস করতেই পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে। দলের নেতারা দাবি করেছেন, উচ্ছেদের আগে পর্যাপ্ত নোটিশ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি।
এই ঘটনার প্রতিবাদে তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভার বাইরেও বিক্ষোভ দেখায়। পাশাপাশি কলকাতা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও জীবিকার উপর আঘাত নামিয়ে আনা হলে তারা চুপ করে থাকবে না।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে রাজ্য ও কেন্দ্রের সংঘাত আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের পুনর্বাসনের প্রশ্নে রাজনৈতিক চাপানউতোর বাড়ছে। অন্যদিকে শাসকদলের বক্তব্য, আইন মেনেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হচ্ছে এবং অবৈধ দখলদারি রুখতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই ইস্যুতে তিনি আক্রমণাত্মক অবস্থানেই থাকবেন। মানুষের অধিকার, পুনর্বাসন এবং সংবিধান রক্ষার প্রশ্নে তিনি আরও বৃহত্তর আন্দোলনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের একাংশও উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আগামী দিনে এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন