আত্মনির্ভর ভারতের বড় সাফল্য, তৈরি হল নতুন সমুদ্র টহল যুদ্ধজাহাজ
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স সংস্থা আগামী ২০ মে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য তৈরি অত্যাধুনিক নতুন প্রজন্মের সমুদ্র টহল যুদ্ধজাহাজের প্রথমটি জলে নামাতে চলেছে। এই বিশেষ যুদ্ধজাহাজ দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই অনুষ্ঠান ঘিরে জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষা মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অধিকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে বিপুল পরিমাণ দেশীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে দেশের আত্মনির্ভরতার পথে এটি আরও এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রতিরক্ষা সামগ্রী তৈরির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই লক্ষ্য পূরণে এই নতুন সমুদ্র টহল যুদ্ধজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স সংস্থা ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য মোট চারটি অত্যাধুনিক নতুন প্রজন্মের সমুদ্র টহল যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে। প্রতিটি যুদ্ধজাহাজ আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত এবং সমুদ্রের কঠিন পরিস্থিতিতেও দীর্ঘ সময় কার্যক্ষম থাকার মতো করে তৈরি করা হয়েছে। এই যুদ্ধজাহাজগুলো শুধু সীমান্ত রক্ষাই নয়, বিভিন্ন জরুরি উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতীয় নৌবাহিনীর সহকারী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল সঞ্জয় বাত্স্যায়ন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। তাঁর স্ত্রী সরিতা বাত্স্যায়ন শুভ উদ্বোধনের মাধ্যমে যুদ্ধজাহাজটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জলে নামাবেন। প্রতিরক্ষা মহলের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগেও গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স বহু গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র টহল যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছে। ভারতীয় নৌবাহিনী এবং ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর জন্য সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরযোগ্য যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করে আসছে। শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও এই সংস্থার তৈরি যুদ্ধজাহাজ বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
২০১৪ সালে মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল একটি বিশেষ যুদ্ধজাহাজ, যার নাম ছিল ব্যারাকুডা। সেটিই ছিল ভারতের তৈরি প্রথম রপ্তানিকৃত যুদ্ধজাহাজ। সেই প্রকল্পের জন্য গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিশেষ উৎকর্ষ সম্মান লাভ করেছিল। দেশীয় প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানের যুদ্ধজাহাজ তৈরি করার ক্ষেত্রে সেই সাফল্য ভারতের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছিল।
নতুন প্রজন্মের এই সমুদ্র টহল যুদ্ধজাহাজগুলি আগের যুদ্ধজাহাজগুলোর তুলনায় আকারে বড় এবং অনেক বেশি শক্তিশালী। এগুলো দীর্ঘ দূরত্বে টানা অভিযান চালাতে সক্ষম হবে। প্রতিটি যুদ্ধজাহাজের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৩ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১৪ দশমিক ৬ মিটার। ওজন প্রায় ৩ হাজার টনের কাছাকাছি। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ায় এগুলো দ্রুতগতিতে সমুদ্রপথে চলতে পারবে এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে টহল দিতে সক্ষম হবে।
এই যুদ্ধজাহাজগুলো সর্বোচ্চ ২৩ নট গতিতে চলতে পারবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট গতিতে চললে একটানা প্রায় ৮ হাজার ৫০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত পথ অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। ফলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘ সময় নজরদারি চালানো অনেক সহজ হয়ে যাবে।
প্রতিটি যুদ্ধজাহাজে ২৪ জন আধিকারিক এবং ১০০-র বেশি নৌসেনা কর্মী মোতায়েন থাকবেন। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি এবং বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সজ্জিত এই যুদ্ধজাহাজ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হবে।
সমুদ্র নজরদারি, উপকূলীয় নিরাপত্তা রক্ষা, জলদস্যু বিরোধী অভিযান, বিশেষ সামরিক অভিযান, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ এবং মানবিক সহায়তা প্রদান—সব ক্ষেত্রেই এই যুদ্ধজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দিতেও এই জাহাজ ব্যবহার করা যাবে।
এছাড়াও সমুদ্রপথে চোরাচালান রোধ, অনুপ্রবেশ বিরোধী অভিযান এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় এই যুদ্ধজাহাজ কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই যুদ্ধজাহাজকে ভাসমান হাসপাতাল হিসেবেও কাজে লাগানো যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের কারণে শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সেই কারণেই আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই নতুন প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তিকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলবে।
দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত এই যুদ্ধজাহাজ শুধু প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিক থেকেও বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ভারত আরও বেশি উন্নত যুদ্ধজাহাজ তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ সংস্থার নতুন সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করবে। পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তির প্রতি আস্থা বাড়িয়ে ভারতের আত্মনির্ভরতার স্বপ্নকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন