রান্নার গ্যাসের বদলে বায়োগ্যাস ব্যবহারে জোর! মন্ত্রিসভায় বড় বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের আশঙ্কার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উপর জোর দেন। বিশেষ করে রান্নার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বায়োগ্যাস ব্যবহারের প্রসার ঘটানোর নির্দেশ দেন তিনি।
সূত্রের খবর, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতা নিয়ে বৈঠকে বিস্তর আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে পৌঁছে থাকে।
পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর শেষে দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রীর এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপের চারটি দেশ সফর করে ফেরার পরপরই তিনি মন্ত্রীদের নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক করেন। বিদেশ সফরের সময়ও পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।
বৈঠকের শুরুতে বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি নিয়ে সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা করেন। এরপর বিভিন্ন মন্ত্রকের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা নিজেদের বিভাগের কাজ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সহজ করে তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সরকারের যেকোনও নতুন পরিকল্পনা বা সংস্কারের ফলে সাধারণ নাগরিকের কোনও অসুবিধা হওয়া চলবে না। বরং প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক এবং সহজ করে তোলা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ শুধুমাত্র বড় প্রকল্প নয়, বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে সাধারণ মানুষ দ্রুত পরিষেবা পাবেন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। তিনি মন্ত্রীদের নির্দেশ দেন, নতুন কোনও নীতি গ্রহণের আগে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর কেমন পড়বে, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে।
বৈঠকে “বিকশিত ভারত ২০৪৭” লক্ষ্য নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দেশের ভবিষ্যতের জন্য সরকারের অঙ্গীকার। তিনি জানান, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ভারতকে উন্নত ও আত্মনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি মন্ত্রীদের সামনে নিজের প্রশাসনিক মূলমন্ত্রও আবার তুলে ধরেন। সংস্কার, কর্মদক্ষতা, পরিবর্তন এবং মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, অতীতের ভুল বা ব্যর্থতা নিয়ে পড়ে না থেকে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
জ্বালানি নিয়ে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে বায়োগ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়োগ্যাস শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, এটি আমদানি নির্ভরতা কমাতেও বড় ভূমিকা নিতে পারে। গ্রামাঞ্চলে গবাদি পশুর বর্জ্য এবং জৈব আবর্জনা ব্যবহার করে সহজেই বায়োগ্যাস তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে রান্নার খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও কমবে।
সরকারি সূত্রের মতে, আগামী দিনে গ্রামীণ এলাকায় বায়োগ্যাস কেন্দ্র গড়ে তোলার কাজ আরও জোরদার হতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদেরও এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, আগামী ৯ জুন কেন্দ্রীয় সরকারের তৃতীয় মেয়াদের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। সেই উপলক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রক গত দুই বছরে নিজেদের কাজের অগ্রগতি নিয়ে রিপোর্ট পেশ করেছে। বিদেশ, কৃষি, বন, সড়ক পরিবহণ, শ্রম, বাণিজ্য এবং জ্বালানি মন্ত্রকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিজেদের সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে।
বৈঠকে মন্ত্রকগুলির কাজের মূল্যায়নও করা হয়। ফাইল নিষ্পত্তির গতি, জনঅভিযোগের সমাধান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মতো বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে সেরা ও সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স করা মন্ত্রকের তালিকাও তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, ততই বিকল্প জ্বালানির গুরুত্ব বাড়ছে। সেই দিক থেকে বায়োগ্যাস এবং অন্যান্য নবীকরণযোগ্য শক্তির উপর জোর দেওয়া ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতের এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন