“গরুরও হবে, ছাগলেরও হবে”, কোরবানি ইস্যুতে শুভেন্দু সরকারকে খোলা চ্যালেঞ্জ হুমায়ুন কবীরের



ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গে ঈদ-উল-আজহা বা বকরিদকে ঘিরে গরু কোরবানি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্যের নতুন সরকার পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কড়া অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ জনউন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীরের সাম্প্রতিক মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কোরবানি ইসলামের বহু শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় প্রথা এবং তা কোনওভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধর্মীয় রীতি যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। তিনি বলেন, ধর্মীয় নিয়ম মেনে মুসলিম সমাজ কোরবানি দেবে এবং সেই প্রথায় কোনও সরকারি হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

রাজ্য সরকারের তরফে সম্প্রতি পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, সেটিকেও সরাসরি প্রশ্নের মুখে তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সরকার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আলাদা নিয়ম করতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় আচার বা বিশ্বাসের মধ্যে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, কোরবানি শুধুমাত্র একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি বহু মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

এই বিতর্কে যোগ দিয়েছেন ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা তোহা সিদ্দিকীও। তিনি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, দেশের এক জায়গায় কোনও নিয়ম কার্যকর হলে তা অন্য জায়গাতেও একইভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তিনি বলেন, দেশে যদি কোনও বিষয়ে আইন থাকে, তবে তা সবার জন্য সমান হওয়া দরকার। কোথাও গরুর মাংস বিক্রি বৈধ, আবার কোথাও নিষিদ্ধ—এই বৈপরীত্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

তোহা সিদ্দিকী আরও বলেন, একদিকে দেশে গরুর মাংস বিদেশে রপ্তানি হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কোরবানি দিতে গেলে আপত্তি ওঠে। তাঁর প্রশ্ন, একই দেশে দুই ধরনের নীতি কীভাবে কার্যকর হতে পারে? তিনি মনে করেন, গোটা দেশের জন্য একক নীতি থাকলে এই ধরনের বিতর্ক অনেকটাই কমে যাবে।

অন্যদিকে, এই বিষয় নিয়ে ভিন্ন মতও সামনে এসেছে। অযোধ্যা মামলার প্রাক্তন পক্ষকার ইকবাল আনসারি মুসলিম সমাজকে গরুর প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ভারতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে গরুর একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং সেই কারণে সমাজের বৃহত্তর অংশের আবেগকে মর্যাদা দেওয়া উচিত। তিনি কেন্দ্র সরকারের কাছে গরুকে জাতীয় পশুর মর্যাদা দেওয়ার দাবিও তুলেছেন।

ইকবাল আনসারির বক্তব্য, দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গরু কোরবানি এড়িয়ে চলা উচিত। তিনি বলেন, বহু সময় কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধরনের বিষয়কে সামনে এনে সামাজিক অশান্তি তৈরির চেষ্টা করে। তাই শান্তি ও সৌহার্দ বজায় রাখার জন্য পারস্পরিক সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছেন কলকাতার নাখোদা মসজিদের ইমাম মৌলানা মহম্মদ শফিক কাসমিও। তিনি মুসলিম সমাজকে সংযম বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে বলেন, দেশের সামাজিক পরিবেশ ও পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব। তাঁর মতে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সময় এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়, যাতে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের মনে আঘাত লাগে।

এদিকে বিরোধী শিবির থেকেও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়েছে। রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামান রাজ্যের পশু জবাই সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন। তবে কলকাতা হাইকোর্ট বকরিদের আগে সরকারের নির্দেশে স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছে। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বেড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আইনি কাঠামো—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে সামাজিক শান্তি বজায় রাখার কথাও বলা হচ্ছে। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সংবেদনশীল ইস্যুতে সকল পক্ষের সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও সমান প্রয়োজনীয়। পারস্পরিক সম্মান ও আলোচনার মাধ্যমেই এমন পরিস্থিতিতে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

বকরিদকে ঘিরে এই বিতর্ক আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের একাংশের আশা, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি অটুট থাকবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মুর্শিদাবাদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি! কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনেই তৃণমূল ও হুমায়ুন কবীর সমর্থকদের সংঘর্ষে চাঞ্চল্য

বাংলায় ১৫২টির মধ্যে ১১০টিরও বেশি আসনে জয়ের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আম আদমি পার্টিতে ফাটল! রাঘব-স্বাতি সহ বিজেপিতে একাধিক সাংসদ