নতুন জিমেইল অ্যাকাউন্ট খুললে আর মিলবে না ফ্রি স্টোরেজ, গুগলের নিয়মে বাড়ল বিতর্ক
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : ডিজিটাল দুনিয়ায় ই-মেইল পরিষেবা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে অনলাইন পড়াশোনা, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা, সামাজিক যোগাযোগ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান—সব ক্ষেত্রেই ই-মেইল অপরিহার্য। আর এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পরিষেবাগুলোর মধ্যে অন্যতম গুগলের জিমেইল। এতদিন নতুন গুগল অ্যাকাউন্ট তৈরি করলেই ব্যবহারকারীরা বিনামূল্যে ১৫ গিগাবাইট পর্যন্ত ক্লাউড সংরক্ষণ সুবিধা পেতেন। কিন্তু এবার সেই নিয়মে বড় পরিবর্তন আনল গুগল।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে কোনও ব্যক্তি যদি নতুন গুগল অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন এবং নিজের মোবাইল নম্বর যাচাই না করেন, তাহলে তিনি মাত্র ৫ গিগাবাইট পর্যন্ত বিনামূল্যের সংরক্ষণ সুবিধা পাবেন। আগে যেখানে জিমেইল, গুগল ড্রাইভ এবং গুগল ফটোস মিলিয়ে সরাসরি ১৫ গিগাবাইট জায়গা ব্যবহার করা যেত, সেখানে এখন পুরো সুবিধা পেতে হলে মোবাইল নম্বর যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গুগলের এই নতুন নীতি ইতিমধ্যেই প্রযুক্তি দুনিয়ায় বড় আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে সংস্থার দাবি, এর মাধ্যমে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট এবং অপব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে বহু ব্যবহারকারী মনে করছেন, এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
এতদিন নতুন অ্যাকাউন্ট খুললেই ব্যবহারকারীরা কোনও অতিরিক্ত শর্ত ছাড়াই ১৫ গিগাবাইট বিনামূল্যের ক্লাউড সংরক্ষণ সুবিধা পেতেন। সেই জায়গায় এখন গুগল তাদের নীতিতে পরিবর্তন এনে “সর্বোচ্চ ১৫ গিগাবাইট” কথাটি ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, সব ব্যবহারকারী আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো সুবিধা পাবেন না। প্রথমে দেওয়া হবে ৫ গিগাবাইট। পরে মোবাইল নম্বর যাচাই সম্পূর্ণ হলে অতিরিক্ত ১০ গিগাবাইট খুলে যাবে।
গুগলের দাবি, এই পদক্ষেপ নেওয়ার অন্যতম কারণ হল ভুয়ো অ্যাকাউন্টের সংখ্যা কমানো। বর্তমানে বহু মানুষ এবং স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার একাধিক নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে বিনামূল্যের ক্লাউড সংরক্ষণ সুবিধার অপব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অপ্রয়োজনীয় তথ্য জমা রাখা হয়, যা সংস্থার পরিকাঠামোর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অনলাইন তথ্য সংরক্ষণের চাহিদা দ্রুত বাড়ার কারণে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর উপরও চাপ বেড়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি ছবি, নথি, ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্য ক্লাউডে জমা হচ্ছে। এই বিপুল তথ্য সংরক্ষণ করতে উন্নত মানের যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ছে। ফলে ব্যয়ও আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। সেই কারণেই গুগল এখন বিনামূল্যের পরিষেবাগুলো আরও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরিচালনা করতে চাইছে।
তবে এই নতুন নিয়ম ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেক ব্যবহারকারী মনে করছেন, শুধুমাত্র ই-মেইল ব্যবহারের জন্য মোবাইল নম্বর শেয়ার করা সবসময় নিরাপদ নয়। বর্তমানে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, প্রতারণা এবং অনলাইন নজরদারির ঘটনা বাড়ছে। তাই অনেকে নিজেদের মোবাইল নম্বর গোপন রাখতে চান। কিন্তু নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পরে সেই ব্যবহারকারীরা পূর্ণ সংরক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
আবার অন্য একটি অংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ মোবাইল নম্বর যাচাই বাধ্যতামূলক হলে ভুয়ো পরিচয়ে একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলা কঠিন হবে। এতে স্প্যাম বার্তা, প্রতারণামূলক কার্যকলাপ এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা কমতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে গুগল আরও কঠোর নিয়ম চালু করতে পারে। বর্তমানে এই পরিবর্তন শুধুমাত্র নতুন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও পরবর্তীতে পুরনো অ্যাকাউন্টগুলোর ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়া চালু হতে পারে। যদিও সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি।
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের এখন আরও সচেতনভাবে নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। যারা বেশি ছবি, ভিডিও বা নথি সংরক্ষণ করেন, তাঁদের জন্য ৫ গিগাবাইট খুব দ্রুত পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাই পূর্ণ সুবিধা পেতে মোবাইল নম্বর যাচাই প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে যারা ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাঁদের জন্য এটি কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে ডিজিটাল পরিষেবাগুলোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সংস্থাগুলো ভুয়ো ব্যবহারকারী এবং অপব্যবহার রোধ করতে চাইছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে চাইছেন। গুগলের নতুন সিদ্ধান্ত সেই বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
আগামী দিনে এই নীতি কতটা সফল হয় এবং ব্যবহারকারীরা কীভাবে তা গ্রহণ করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, নতুন জিমেইল অ্যাকাউন্ট খোলার অভিজ্ঞতা এখন আর আগের মতো সহজ ও শর্তহীন থাকছে না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন