পৃথিবী কি ধ্বংসের আরও কাছে? ভয় দেখাচ্ছে ‘প্রলয় ঘড়ি’, মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে মানবসভ্যতা
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : মানবসভ্যতা কি সত্যিই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে? বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, জলবায়ুর সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি এখন বিজ্ঞানীদের গভীরভাবে চিন্তায় ফেলছে।
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বৈজ্ঞানিক সংস্থা ‘বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ সম্প্রতি তাদের বিখ্যাত ‘প্রলয় ঘড়ি’ আরও কয়েক সেকেন্ড এগিয়ে দিয়েছে। এর ফলে মানবসভ্যতা এখন প্রতীকীভাবে মধ্যরাত থেকে মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৪৭ সালে এই ঘড়ির সূচনা হওয়ার পর বর্তমান সময়ই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কী এই ‘প্রলয় ঘড়ি’?
‘প্রলয় ঘড়ি’ আসলে কোনও বাস্তব ঘড়ি নয়। এটি একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা, যার মাধ্যমে বোঝানো হয় পৃথিবী কতটা বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কিছু বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এই ধারণার সূচনা করেছিলেন। তাঁদের মূল উদ্বেগ ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা এবং ভবিষ্যতে মানবজাতির নিরাপত্তা।
এই ঘড়িতে ‘মধ্যরাত’কে ধ্বংস বা সভ্যতার অবসানের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটা যত মধ্যরাতের কাছে এগোয়, ততই বোঝানো হয় পৃথিবী ভয়ঙ্কর বিপদের দিকে এগোচ্ছে। পারমাণবিক যুদ্ধ, ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত বিপর্যয় কিংবা বিশ্বব্যাপী সংঘর্ষ— সব মিলিয়ে মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়
১৯৪৭ সালে প্রথমবার যখন এই ঘড়ি প্রকাশ করা হয়েছিল, তখন সেটি মধ্যরাতের সাত মিনিট আগে রাখা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন সময়ে বিশ্ব পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে ঘড়ির সময় এগিয়েছে কিংবা পিছিয়েছে।
সবচেয়ে নিরাপদ সময় ধরা হয় ১৯৯১ সালকে। সেই সময় আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘ শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটে। পারমাণবিক উত্তেজনা অনেকটাই কমে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা ঘড়িকে পিছিয়ে মধ্যরাতের ১৭ মিনিট আগে স্থির করেছিলেন।
কিন্তু তারপর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, নতুন অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘর্ষ ক্রমশ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে এই ঘড়ি মধ্যরাতের ৯০ সেকেন্ড আগে পৌঁছেছিল। পরে সেটি ৮৯ সেকেন্ডে আনা হলেও এবার আবার আরও এগিয়ে ৮৫ সেকেন্ডে পৌঁছে গিয়েছে। অর্থাৎ বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
কেন এগিয়ে দেওয়া হল ঘড়ির কাঁটা?
বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে একাধিক বৈশ্বিক সংকট একসঙ্গে পৃথিবীকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা।
বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো নিজেদের সামরিক ক্ষমতা বাড়াতে নতুন নতুন বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছে। বিশেষ করে রাশিয়া, আমেরিকা এবং চিনের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনও বড় সংঘর্ষ বা ভুল সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। আর সেই যুদ্ধে যদি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার হয়, তাহলে গোটা পৃথিবীর জন্য তা হবে বিপর্যয়কর।
যুদ্ধ পরিস্থিতি বাড়াচ্ছে ভয়
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলতে থাকা সংঘর্ষও বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একাধিক দেশে যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে এমন অনেক সংঘর্ষ রয়েছে যেখানে বড় শক্তিধর দেশগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। ফলে ছোট কোনও সংঘর্ষও দ্রুত বড় আকার নিতে পারে। এতে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের বদলে অনেক দেশ সামরিক শক্তির উপর বেশি নির্ভর করছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
জলবায়ুর সংকটও বড় কারণ
শুধু যুদ্ধ নয়, পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনও এই ঘড়িকে মধ্যরাতের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভয়াবহ দাবানল, অতিবৃষ্টি, খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনযাত্রাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বহু দেশে পানীয় জলের সংকট এবং খাদ্যের অভাব ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘর্ষের কারণ হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
ইতিহাসে এই প্রথম বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও বৈশ্বিক ঝুঁকির বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দ্রুত উন্নত হতে থাকা এই প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করছে, তেমনই নতুন বিপদের আশঙ্কাও তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, সাইবার হামলা, স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধাস্ত্র পরিচালনা এবং সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বদলে যন্ত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ ডেকে আনতে পারে।
এখনও কি বাঁচার আশা আছে?
বিজ্ঞানীরা যদিও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন, তবুও তাঁরা আশা ছাড়তে নারাজ। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তিপূর্ণ কূটনীতি, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এখনও বিপদ এড়ানো সম্ভব।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যদি নিজেদের স্বার্থের বাইরে গিয়ে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা।
‘প্রলয় ঘড়ি’ তাই শুধু একটি প্রতীক নয়, এটি গোটা মানবজাতির জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা— এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যৎ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন