পৃথিবীর সেই কোণ, পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ছুঁয়ে আসতে পারেন ভবিষ্যৎ
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : সময় ভ্রমণ বা টাইম ট্রাভেল— বিষয়টি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, সিনেমা কিংবা রহস্যে ভরা ভবিষ্যতের কোনও জগৎ। মানুষ বহু বছর ধরেই সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার স্বপ্ন দেখে এসেছে। কেউ অতীতে ফিরে যেতে চায়, কেউ আবার ভবিষ্যতের ঝলক দেখতে চায়। যদিও বাস্তবে বিজ্ঞান এখনও মানুষকে সময়ের মধ্যে সামনে বা পিছনে নিয়ে যাওয়ার মতো প্রযুক্তি তৈরি করতে পারেনি, তবুও পৃথিবীতে এমন একটি জায়গা রয়েছে যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি সত্যিই “ভবিষ্যৎ” ছুঁয়ে আসার অনুভূতি পেতে পারেন।
শুনতে অবাক লাগলেও ঘটনাটি একেবারেই সত্যি। পৃথিবীর উত্তর প্রান্তে, বরফে ঢাকা এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে ডায়োমেড দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপের এক দিক থেকে অন্য দিকে গেলেই আপনি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী একদিন এগিয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ, কয়েক কিলোমিটারের পথ পেরিয়ে আপনি যেন ভবিষ্যতে পৌঁছে যান!
কোথায় রয়েছে এই রহস্যময় দ্বীপ?
ডায়োমেড দ্বীপপুঞ্জ অবস্থিত বেরিং প্রণালীতে, যা রাশিয়া এবং আমেরিকার আলাস্কার মাঝখানে অবস্থিত। এই দ্বীপ আসলে দুটি অংশে বিভক্ত— বিগ ডায়োমেড এবং লিটল ডায়োমেড।
বিগ ডায়োমেড রাশিয়ার অংশ, আর লিটল ডায়োমেড আমেরিকার অন্তর্গত। দুটি দ্বীপের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ৪.৮ কিলোমিটার। এত কম দূরত্ব হওয়া সত্ত্বেও, এই দুই দ্বীপের সময়ের ব্যবধান প্রায় ২১ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে সময় ভ্রমণের সেই অদ্ভুত অনুভূতি।
কেন সময়ের এত বড় পার্থক্য?
এর মূল কারণ হল আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা বা International Date Line। এটি একটি কাল্পনিক রেখা, যা উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখান দিয়ে বিস্তৃত।
এই রেখা পৃথিবীর ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের সীমারেখা হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, এই রেখা পার হলেই দিন বদলে যায়। পৃথিবীর এক অংশে যখন রবিবার, তখন রেখার অপর পাশে সোমবার শুরু হয়ে যেতে পারে।
ডায়োমেড দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়েই এই আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা চলে গিয়েছে। ফলে এক দ্বীপে দাঁড়িয়ে আপনি বর্তমান দিনে থাকলেও, অন্য দ্বীপে পা রাখলেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ভবিষ্যতের দিনে পৌঁছে যান।
‘টুমরো আইল্যান্ড’ ও ‘ইয়েস্টারডে আইল্যান্ড’
এই অদ্ভুত সময়ের পার্থক্যের কারণেই বিগ ডায়োমেডকে বলা হয় “টুমরো আইল্যান্ড” অর্থাৎ আগামীকালের দ্বীপ। অন্যদিকে, লিটল ডায়োমেড পরিচিত “ইয়েস্টারডে আইল্যান্ড” নামে।
ধরুন, আপনি রবিবার লিটল ডায়োমেড থেকে যাত্রা শুরু করলেন। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে বিগ ডায়োমেডে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে হয়ে যাবে সোমবার। অর্থাৎ, আপনি যেন একদিন ভবিষ্যতে চলে গেলেন!
এই কারণেই বহু মানুষ মজার ছলে বলেন, পৃথিবীতে যদি কোথাও দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ ছুঁয়ে আসা যায়, তবে সেটি ডায়োমেড দ্বীপপুঞ্জ।
শীতকালে তৈরি হয় বরফের সেতু
এই অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম শীতল এলাকা। শীতকালে তাপমাত্রা এতটাই কমে যায় যে দুই দ্বীপের মাঝের সমুদ্র বরফে জমে যায়। তখন বরফের উপর দিয়ে হেঁটে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়াও সম্ভব হয়।
ভাবুন তো, বরফের রাস্তা ধরে কয়েক মিনিট হাঁটলেন আর পৌঁছে গেলেন ভবিষ্যতের দিনে— সত্যিই যেন সিনেমার গল্প!
তবে বাস্তবে এই যাত্রা এত সহজ নয়। কারণ এই দুটি দ্বীপ দুই আলাদা দেশের অন্তর্গত এবং মাঝখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত।
ইতিহাসেও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব
ডায়োমেড দ্বীপপুঞ্জ প্রথম আবিষ্কার করেন ডেনিশ-রাশিয়ান নাবিক ভিটাস বেরিং। ১৭২৮ সালের ১৬ আগস্ট তিনি এই অঞ্চল আবিষ্কার করেন। পরে তাঁর নাম অনুসারেই বেরিং প্রণালীর নামকরণ করা হয়।
পরবর্তীতে এই দ্বীপ দুই দেশের নিয়ন্ত্রণে ভাগ হয়ে যায়। বিগ ডায়োমেড চলে যায় রাশিয়ার অধীনে এবং লিটল ডায়োমেড থাকে আমেরিকার অংশ হিসেবে।
শীতল যুদ্ধের সময় এই এলাকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এখানে আমেরিকা ও রাশিয়ার সীমান্ত এতটাই কাছাকাছি যে অনেকেই একে “আইস কার্টেন” বলেও উল্লেখ করতেন।
এখন কি সেখানে যাওয়া যায়?
বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য এই দ্বীপে ভ্রমণ খুবই সীমিত। রাশিয়া ও আমেরিকার রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে এখানে অবাধ যাতায়াতের অনুমতি নেই।
লিটল ডায়োমেডে অল্প কিছু মানুষ বসবাস করলেও বিগ ডায়োমেড প্রায় জনশূন্য। বিশেষ অনুমতি ছাড়া এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়া আইনত নিষিদ্ধ।
তবুও এই জায়গা পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় ও আকর্ষণীয় স্থানের মধ্যে একটি। বিজ্ঞান, ভূগোল এবং সময়ের অদ্ভুত সম্পর্ককে এত কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ পৃথিবীর আর কোথাও নেই বললেই চলে।
বিজ্ঞান আর কল্পনার মাঝামাঝি এক অভিজ্ঞতা
যদিও এটি বাস্তব অর্থে টাইম ট্রাভেল নয়, তবুও ডায়োমেড দ্বীপপুঞ্জ মানুষকে সময় সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে দুই ভিন্ন দিন দেখা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
সময়কে আমরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটায় মাপি, কিন্তু পৃথিবীর ভৌগোলিক অবস্থান যে সময়ের ধারণাকেও বদলে দিতে পারে, ডায়োমেড তারই জীবন্ত উদাহরণ। তাই অনেকের কাছেই এটি শুধু একটি দ্বীপ নয়, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য সময়-সীমানা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন