চিকেন নেক নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত, কেন্দ্রকে ১২০ একর জমি দিল রাজ্য সরকার
পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্য সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্য সরকার শিলিগুড়ি করিডরের অন্তর্গত প্রায় ১২০ একর জমি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, নিরাপত্তা পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেই এই জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। এই সময় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক শীর্ষ আধিকারিকও উপস্থিত ছিলেন।
শিলিগুড়ি করিডর, যাকে সাধারণভাবে “চিকেন নেক” বলা হয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরু ভূখণ্ড। এই করিডরের প্রস্থ মাত্র কুড়ি থেকে বাইশ কিলোমিটার। একদিকে নেপাল, অন্যদিকে ভুটান ও বাংলাদেশ, আর কাছেই চিনের সীমান্ত — এমন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল দেশের নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই করিডর ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার একমাত্র স্থলপথ এটি। সেনাবাহিনীর যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ — সবকিছুই এই করিডরের উপর নির্ভরশীল। ফলে এই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত এলাকায় আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি উঠছিল। এবার সেই দাবিকে গুরুত্ব দিয়েই জমি হস্তান্তরের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জানা গিয়েছে, এই জমিতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর জন্য আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি করা হতে পারে। পাশাপাশি নতুন রাস্তা নির্মাণ, নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত করা, নিরাপত্তা শিবির গড়ে তোলা এবং সীমান্ত এলাকায় দ্রুত বাহিনী মোতায়েনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি, তবুও নিরাপত্তা জোরদারের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার গঠন করার পর থেকেই প্রশাসনিক স্তরে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী দুটি কেন্দ্র থেকেই জয়লাভ করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রদবদল শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা, দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা দেবে। কারণ সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠলে সীমান্তে নজরদারি আরও বাড়বে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কাজও সহজ হবে।
এছাড়াও, এই পদক্ষেপ উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। উন্নত রাস্তা ও পরিকাঠামো গড়ে উঠলে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কাছেও এটি স্বস্তির খবর বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু সামরিক বা প্রশাসনিক দিক থেকেই নয়, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নেও শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখতে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সুদৃঢ় যোগাযোগ ধরে রাখতে এই করিডরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাই রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক মহলে এখন জোর আলোচনা শুরু হয়েছে, আগামী দিনে রাজ্য ও কেন্দ্র একসঙ্গে আরও কী কী পদক্ষেপ নিতে চলেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন সরকার নিজেদের কার্যক্ষমতা প্রমাণ করতে চাইছে বলেই মনে করা হচ্ছে। শিলিগুড়ি করিডরে জমি হস্তান্তরের এই সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন