বকরিদে পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা বহাল! রাজ্যের নির্দেশে সায় কলকাতা হাই কোর্টের
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : বকরিদের আগে পশ্চিমবঙ্গে পশু কুরবানি নিয়ে জারি হওয়া সরকারি নির্দেশকে বহাল রাখল কলকাতা হাই কোর্ট। রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে গরু, বলদ, ষাঁড়, বাছুর এবং মোষ জবাইয়ের ক্ষেত্রে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একাধিক আবেদন খারিজ করে দিয়েছে আদালত। আদালতের এই রায়কে ঘিরে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, রাজ্য সরকারের জারি করা বিজ্ঞপ্তি পূর্ববর্তী আদালতের নির্দেশ মেনেই প্রকাশ করা হয়েছে। তাই এই বিজ্ঞপ্তি স্থগিত করা বা বাতিল করার কোনও কারণ আদালত খুঁজে পায়নি।
আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০১৮ সালের একটি মামলায় সমন্বয় বেঞ্চ যে নির্দেশ দিয়েছিল, সেটি ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। সেই নির্দেশের ভিত্তিতেই বর্তমান বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ফলে নতুন করে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই বলেই মত আদালতের।
কী নিয়ে বিতর্ক?
বকরিদ উপলক্ষে পশু কুরবানি ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্প্রতি একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে বলা হয়, গরু, বলদ, ষাঁড়, বাছুর ও মোষ জবাই করার আগে অবশ্যই সরকারি পশু চিকিৎসকের স্বাস্থ্য শংসাপত্র নিতে হবে। সেই শংসাপত্র ছাড়া কোনও অবস্থাতেই পশু জবাই করা যাবে না।
সরকার আরও জানিয়েছে, প্রকাশ্য রাস্তাঘাট বা জনসমক্ষে পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। নির্দেশ অমান্য করলে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এই নির্দেশের বিরোধিতা করে একাধিক আবেদন জমা পড়ে আদালতে। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, নতুন নিয়ম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও সমস্যা তৈরি করবে।
কারা আবেদন করেছিলেন?
এই মামলায় আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং তৃণমূলের বিধায়ক আখরুজ্জামান। শুনানির সময় মহুয়া মৈত্র আদালতেও উপস্থিত ছিলেন।
আবেদনকারীদের তরফে আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, ১৯৫০ সালের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন ধর্মীয় কুরবানির বিরুদ্ধে তৈরি করা হয়নি। তাঁদের বক্তব্য, বকরিদের ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী সুস্থ পশুর কুরবানি দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী শুধুমাত্র বৃদ্ধ বা স্থায়ীভাবে অক্ষম পশুকেই জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, যা ধর্মীয় রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
আইনজীবীরা আরও বলেন, ইসলামি রীতি অনুযায়ী অসুস্থ বা বিকলাঙ্গ পশুর কুরবানি গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে নতুন নিয়ম বাস্তবে ধর্মীয় আচারে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সরকারের বক্তব্য কী?
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, এই নির্দেশ কোনও নতুন আইন নয়। বহু পুরনো আইন মেনেই এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। সরকারের দাবি, পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এই নিয়ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, শুধুমাত্র সেই পশুকেই জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হবে যার বয়স ১৪ বছরের বেশি অথবা যে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে। তবে সেই ক্ষেত্রেও সরকারি পশু চিকিৎসকের শংসাপত্র বাধ্যতামূলক।
সরকারের মতে, নিয়ম না মানলে বেআইনি পশু জবাই বাড়তে পারে এবং স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
আদালত কী বলল?
ডিভিশন বেঞ্চ আবেদনকারীদের যুক্তি শোনার পর জানায়, এই মুহূর্তে সরকারি নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। আদালত জানায়, আগের নির্দেশ কার্যকর রয়েছে এবং সেটি মানা বাধ্যতামূলক।
তবে আদালত রাজ্য সরকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনার নির্দেশও দিয়েছে। আদালত বলেছে, ঈদের সময় কোনও বিশেষ ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিবেচনা করতে হবে সরকারকে।
এই পর্যবেক্ষণের ফলে এখন নজর রাজ্য সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়কেও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে আইন ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বকরিদের আগে পশু কেনাবেচা, পরিবহণ এবং কুরবানি ঘিরে প্রতি বছরই বড় অর্থনৈতিক কার্যকলাপ দেখা যায়। ফলে নতুন নিয়মের প্রভাব গ্রামীণ বাজার এবং পশু ব্যবসায়ীদের উপরও পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
অন্যদিকে প্রশাসনের দাবি, নিয়ম মেনে পশু জবাই হলে জনস্বাস্থ্য এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির একাংশের দাবি, রাজ্য সরকার ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। অন্যদিকে শাসক দলের বক্তব্য, আইন মেনেই সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং আদালতও সেই অবস্থানকেই সমর্থন করেছে।
সব মিলিয়ে বকরিদের আগে পশ্চিমবঙ্গে পশু কুরবানি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এখন দেখার, আদালতের পর্যবেক্ষণের পর রাজ্য সরকার কোনও অতিরিক্ত ছাড় বা নতুন নির্দেশ জারি করে কি না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন