স্বাস্থ্যসাথীর সঙ্গে যুক্ত হবে আয়ুষ্মান ভারত! বড় সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রীর, উত্তরবঙ্গে নতুন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রস্তাব
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল রাজ্য সরকার। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী -র সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, আগামী জুলাই মাস থেকে রাজ্যে আবার চালু হবে আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য কার্ড। দীর্ঘদিন পর কেন্দ্রের এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রকল্পে ফের যুক্ত হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ। এর ফলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের দাবি, বর্তমানে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় ছয় কোটি উপভোক্তাকে ধাপে ধাপে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে শুধু রাজ্যের বাসিন্দারাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজের সূত্রে থাকা বাংলার মানুষও এই স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা নিতে পারবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক দেশ এক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আসায় বহু দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমবে।
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প প্রথম পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়েছিল ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। তবে পরবর্তীতে তৎকালীন তৃণমূল সরকার ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। সেই সময় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে প্রকল্পের নাম এবং কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এরপর রাজ্য সরকার স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে গুরুত্ব দিয়ে নিজস্ব স্বাস্থ্যবিমা পরিষেবা চালিয়ে যায়। কিন্তু নতুন সরকারের সিদ্ধান্তে ফের কেন্দ্রীয় প্রকল্পে ফেরা রাজনীতিতেও নতুন জল্পনা তৈরি করেছে।
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করতে কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের জন্য ৯৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত দুই বছরে কেন্দ্র থেকে যে অর্থ পাঠানো হয়েছিল কিন্তু আগের সরকার গ্রহণ করেনি, সেই অর্থও নতুন করে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই অর্থ রাজ্যের হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং চিকিৎসা পরিষেবার উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আরও একাধিক বড় ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৩০ মে থেকে কলকাতার বিধাননগর হাসপাতালে বিশেষ টিকাকরণ কর্মসূচির সূচনা হবে। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গকে সাত লক্ষেরও বেশি টিকার ডোজ সরবরাহ করা হবে। একই দিনে শুরু হবে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষ টিকাকরণ অভিযান। স্বাস্থ্য দপ্তরের মতে, অল্পবয়সি মেয়েদের মধ্যে এই টিকা পৌঁছে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
বৈঠকে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়ন অভিযান এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা আশ্বাস দেন, পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে কেন্দ্র সর্বতোভাবে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অধীনে পশ্চিমবঙ্গের জন্য মোট ৩৫০৫ কোটি ৫৯ লক্ষ টাকা অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম কিস্তি হিসেবে ইতিমধ্যেই ৫২৭ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও যক্ষ্মামুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্য এবং দেশজুড়ে চলা টিকাকরণ অভিযানের কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি না হলে এই ধরনের স্বাস্থ্য অভিযান সম্পূর্ণ সফল করা সম্ভব নয়।
রাজ্যে সাধারণ মানুষের সস্তায় ওষুধ পৌঁছে দিতে ৪৬৯টি প্রধানমন্ত্রী জনঔষধি কেন্দ্র খোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলিতে বাজারদরের তুলনায় অনেক কম মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাবে। এর ফলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং পশ্চিম বর্ধমানে নতুন মেডিক্যাল কলেজ গড়ার প্রস্তাব কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গে সর্বভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের আদলে একটি আধুনিক হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের মানুষকে আর জটিল চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হবে না।
রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অধীনে আরও ২১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। শনিবারই রাজ্যের হাতে ৫০০ কোটি টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ২০২১-২২ অর্থবর্ষের ব্যবহার সংক্রান্ত নথি আগামী ৩০ মে-র মধ্যে জমা পড়লে আগের বকেয়া অর্থও দ্রুত ছেড়ে দেওয়া হবে বলে কেন্দ্র আশ্বাস দিয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য পরিষেবার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে। রাজ্যে অনুমোদিত পদের তুলনায় মাত্র ৫৩ শতাংশ চিকিৎসক ও নার্স কর্মরত রয়েছেন। বহু সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের অভাব স্পষ্ট। এর ফলে রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
এছাড়াও পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশের বহু রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এই হার বেশি বলে জানানো হয়েছে। কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম এবং মালদহ জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চিন্তার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পুষ্টির অভাব, পর্যাপ্ত চিকিৎসার ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব এর অন্যতম কারণ।
সব মিলিয়ে নতুন স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও কেন্দ্রীয় সহায়তার ফলে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এই প্রকল্পগুলি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ মানুষ কতটা উপকৃত হন, সেটাই দেখার।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন