অভিষেককে ঘিরে ৪৩ সম্পত্তির তালিকা প্রকাশ! তপ্ত বাংলার রাজনীতি, সায়নীর নাম জড়াতেই নতুন মোড়



পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এবার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জী। রাজ্য বিজেপির পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা ৪৩টি সম্পত্তির একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এই তালিকা সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। বিজেপির অভিযোগ, এই সম্পত্তিগুলির অনেকগুলোই পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নামে যৌথভাবে কেনা হয়েছে। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।





এই বিতর্ক এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন কলকাতা পুরসভা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা ১৭টি ঠিকানায় নোটিস পাঠিয়েছে। ওই নোটিসে ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, অনুমোদন এবং নির্মাণবিধি সংক্রান্ত একাধিক তথ্য চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কিছু জায়গায় নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ম মানা হয়নি। পুরসভার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।





বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে হরিশ মুখার্জি রোডের একটি বহুতল ভবনের নামও। অভিযোগ, ওই ভবনটি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন হিসেবে পরিচিত। পুরসভা ভবনের লিফট, অতিরিক্ত নির্মাণ এবং অনুমোদনের কাগজপত্র সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।





বিজেপির দাবি, এই সম্পত্তিগুলির প্রকৃত মালিকানা এবং কেনার জন্য ব্যবহৃত অর্থের উৎস নিয়ে বড় ধরনের তদন্ত হওয়া উচিত। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, কিছু সম্পত্তি একটি নির্দিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে কেনা হয়েছে এবং সেই সংস্থার সঙ্গে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিজেপি নেতারা দাবি করেছেন, দুর্নীতির মাধ্যমে বেআইনি সম্পত্তি গড়ে তোলা হয়েছে এবং এর পেছনে বড় আর্থিক অনিয়ম থাকতে পারে।




এ প্রসঙ্গে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপও করা হবে। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের অর্থ লুট করে কেউ পার পাবে না। বিরোধী শিবিরের এই মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।






অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস গোটা ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে ব্যাখ্যা করেছে। দলের নেতাদের বক্তব্য, শুধুমাত্র নামের মিল বা গুজবের ভিত্তিতে মানুষকে জড়ানোর চেষ্টা চলছে। তৃণমূলের দাবি, বিরোধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে। দলের তরফে আরও বলা হয়েছে, যেসব তথ্য সামনে আনা হয়েছে, তার অধিকাংশই যাচাই করা নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই।





প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ শাকেট গোখলে এই তালিকাকে ভুয়ো ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন। তাঁর কথায়, কোনও তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে রাজনৈতিক প্রচার চালানো অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ চাইলে স্বাধীনভাবে এই তথ্য যাচাই করতে পারেন এবং তাহলেই প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।

এই বিতর্কে নতুন মোড় আসে অভিনেত্রী ও সাংসদ সায়নী ঘোষের নাম জড়িয়ে পড়ায়। তালিকায় ‘সায়নী ঘোষ’ নাম উল্লেখ থাকায় সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত গুজব ছড়িয়ে পড়ে। 




অনেকেই বিষয়টিকে তৃণমূল সাংসদের সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করেন। যদিও সায়নী ঘোষ স্পষ্ট ভাষায় সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কোনও প্রমাণ ছাড়াই তাঁর নাম জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মিথ্যা খবর ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






পুরো ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমেও তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। একাংশের দাবি, দুর্নীতির অভিযোগের পূর্ণ তদন্ত হওয়া উচিত। অন্যদিকে, শাসকদলের সমর্থকদের বক্তব্য, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতেই এই ধরনের প্রচার চালানো হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে এই ইস্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।





এই পরিস্থিতির মধ্যেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, রাজনৈতিক চাপ বা ভয় দেখিয়ে তাঁকে থামানো যাবে না। নোটিস পাঠানো হোক কিংবা অন্য কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হোক, তিনি তাঁর রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেই দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁর মূল লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে তিনি পিছিয়ে পড়বেন না।




বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বর্তমানে অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বিরোধীরা দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে শাসকদলকে চাপে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করছে, বিরোধীরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষের রূপ নিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।




বর্তমানে সাধারণ মানুষের নজর রয়েছে তদন্ত এবং সরকারি পদক্ষেপের দিকে। অভিযোগের সত্যতা কতটা, তা সময়ই বলবে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি যে আরও উত্তপ্ত হতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মুর্শিদাবাদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি! কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনেই তৃণমূল ও হুমায়ুন কবীর সমর্থকদের সংঘর্ষে চাঞ্চল্য

বাংলায় ১৫২টির মধ্যে ১১০টিরও বেশি আসনে জয়ের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আম আদমি পার্টিতে ফাটল! রাঘব-স্বাতি সহ বিজেপিতে একাধিক সাংসদ