‘গো ব্যাক’ স্লোগানের মাঝেই ডিম ঢিল, ছিঁড়ল শার্টের বোতাম! অভিষেককে ঘিরে বিক্ষোভ
ট্রেন্ড টেলস ডেস্ক : ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহত দলীয় কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে যাওয়ার পথে তাঁর কনভয়কে ঘিরে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সেখানে ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ।
দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের একাংশ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ির সামনে এসে প্রতিবাদ দেখান। পরে তিনি চারচাকার গাড়ি ছেড়ে মোটরবাইকে করে সঞ্জু কর্মকারের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। সেই সময়ও বিক্ষোভ চলতে থাকে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের দাবি, তাঁর দিকে ডিম ও অন্যান্য বস্তু ছোড়া হয়। বিশৃঙ্খলার মধ্যে তাঁর পরনের শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যায় এবং চশমাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানা যায়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর নিরাপত্তার স্বার্থে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি হেলমেট পরতে দেখা যায়। পরে তিনি নিহত কর্মীর বাড়িতে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, হেলমেট থাকার কারণেই বড় ধরনের আঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন যে, এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশি উপস্থিতি ছিল না এবং আক্রান্ত পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগমনের আগেই বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক বিক্ষোভের ছবি সামনে আসে। কোথাও কালো পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ দেখানো হয়, আবার কোথাও ‘গো ব্যাক’ স্লোগান তোলা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। বিজেপি সমর্থকদের একাংশ এই বিক্ষোভে অংশ নেন বলে তৃণমূলের অভিযোগ। যদিও বিরোধী শিবিরের তরফে দাবি করা হয়েছে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই প্রতিবাদ হয়েছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু হিংসার মাধ্যমে কোনও সমস্যার সমাধান হয় না। নিহত কর্মীর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানান তিনি। একই সঙ্গে রাজ্যপাল এবং আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণের কথাও উল্লেখ করেন।
শনিবারের কর্মসূচিতে সোনারপুর ছাড়াও কলকাতার বেলেঘাটায় ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত আরেক তৃণমূল কর্মী বিশ্বনাথ পট্টনায়েকের পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন অভিষেক। তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তিনি। নিহতদের পরিবারের পাশে দল থাকবে বলেও আশ্বাস দেন।
এদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির মাঝেই আরেকটি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়। দুপুরে রাজ্য সিআইডি-র একটি দল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে যায় বলে খবর প্রকাশ্যে আসে। বিধানসভা-সংক্রান্ত একটি তদন্তের সূত্রে এই পদক্ষেপ বলে জানা যায়। যদিও তখন তিনি বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না। পরে কালীঘাটে নিজের পারিবারিক বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক জানান যে তিনি সংশ্লিষ্ট নোটিস গ্রহণ করেছেন।
সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, তদন্তকারী সংস্থার নোটিস পাওয়া নতুন কিছু নয় এবং তিনি আইন মেনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ করার কোনও প্রশ্ন নেই বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের অধিকার।
কালীঘাটে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ তাঁকে মাঠে নামা থেকে বিরত রাখতে পারবে না। ভোট-পরবর্তী হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে দেখা করাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য এবং সেই কর্মসূচি তিনি চালিয়ে যাবেন বলে জানান।
উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও হিংসার অভিযোগ সামনে এসেছে। শাসক ও বিরোধী— উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর এবং কর্মী-সমর্থকদের উপর আক্রমণের অভিযোগ তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করতে এলাকায় যাচ্ছেন।
সোনারপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক তরজা তীব্র হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের দাবি, জনগণের ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবেই বিক্ষোভ দেখা গেছে। ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং অভিযোগগুলির সত্যতা খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনিক স্তরে নজরদারি চলছে বলে সূত্রের খবর।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে শনিবারের এই ঘটনাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ভোট-পরবর্তী হিংসা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ— সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ যে এখনও উত্তপ্ত, সোনারপুরের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আরও একবার সামনে এনে দিল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন